আওয়ামী লীগের ৭২ বছর : ইতিহাসের আগের কথা

সম্পাদকের কথা : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্ম ইতিহাস আমরা সবাই মোটামুটি জানি। তিনি কারাগারে থাকতে গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলনের ভেতর দিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ আত্মপ্রকাশ করে। প্রথম সভাপতি মওলানা ভাসানি। সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। যুগ্ম সম্পাদক হন শেখ মুজিবুর রহমান। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাকে কেউ কেউ ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো কারাগারে যাওয়ার আগেই সহকর্মীদের সাথে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেছেন। তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর মন্তব্য আমরা পাঠ করেছি।

আমার কথা হলো বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা যেমন আকস্মিক ছিল না, তেমনি একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল গঠনের চিন্তাও আকস্মিক ছিল না। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট তারিখেই শেখ মুজিব কলকাতা অবস্থানকালেই ইসলামিয়া কলেজের সিরাজ-উদ-দৌলা হলে পূর্ববঙ্গ থেকে কলকাতায় পড়তে আসা তৎকালীন মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা নুরুদ্দিন, আতাউর রহমান (রাজশাহী), কামারুজ্জামান এবং কমিউনিস্ট প্রভাবিত ছাত্র ফেডারেশনের নেতা শহীদুল্লাহ কায়সার, কে. জি মোস্তফা ও মোয়াজ্জেম আহম্মদ চৌধুরী প্রমুখদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি সুস্পষ্ট করে বলেছেন, যে পাকিস্তান গঠিত হয়েছে, তাতে ঔপনিবেশিকতার শেষ হয়নি; বরং পূর্ববঙ্গের মানুষ নতুন শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে চলেছে। এটা মানা যায় না। ঢাকায় গিয়ে আমাদের নতুন করে সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। ১৯৭২ ছাত্রলীগের সম্মেলনে তিনি তার স্বপ্নের কথা বলেছেন। আর ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনে প্রখ্যাত ভারতীয় লেখক-বুদ্ধিজীবী অন্নদা শঙ্করের প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশের কথা আপনি কবে থেকে ভেবেছেন? বঙ্গবন্ধু স্মিত হাস্যে বলেছেন, যেদিন পাকিস্তান হয়েছে, সেদিন থেকেই। অর্থাৎ সিরাজ-উদ-দৌলা হোস্টেলে অনুষ্ঠিত সভায় যে-কথা তিনি বলেছিলেন, সে-কথারই প্রতিধ্বনি শোনা যায়। ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দিন থেকেই বঙ্গবন্ধু বাঙালির জন্য স্বতন্ত্র জাতি-রাষ্ট্রের কথা বলেছিলেন।
আর দল গঠনের চিন্তার স্ফুরণ হয় কখন? এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর প্রথম জীবনীকার কাজী কামাল আহমেদ ১৯৭০ সালে ইংরেজিতে প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশের জন্ম’ গ্রন্থে চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেছেন। কাজী কামাল আহমদ এ প্রসঙ্গে লিখেছেন-
“মাঝে মাঝে আমরা ছবি দেখতে যেতাম। একবার শেখ মুজিব, আশরাফউদ্দিন এবং আমি একটা বাংলা ছবি দেখতে যাই। আমরা বেশ আগেই চলে গিয়েছিলাম এবং ভেতরে বসে গম্ভীরভাবেই (শেখ মুজিব) আমাকে বলেন, ‘চলো আমরা একটা রাজনৈতিক দল শুরু করি’, তুমি লিখবে আর আশরাফউদ্দিন আমাদের টাকা যোগাবে।” এই চিন্তা বাস্তবায়নের তাৎক্ষণিক কোনো উদ্যোগ ছিল না বটে। তবে শেখ মুজিবের উল্লিখিত মন্তব্য থেকেই বোঝা যায় ‘নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের’ চিন্তা আকস্মিক ছিল না। বস্তুত পাকিস্তান হওয়ার আগেই তিনি তার মনের মতো একটি রাজনৈতিক দল গঠনের চিন্তা করেছেন।
বঙ্গবন্ধুর চিন্তাপ্রসূত জাতি-রাষ্ট্রে বাংলাদেশ যেমন আজ বাস্তব তেমনি নতুন দলের চিন্তাপ্রসূত আওয়ামী লীগ আজ বাস্তব। ১৯৪৯ সালে দল গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়, আর সেই দলÑ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এক নদী রক্তের বিনিময়ে প্রিয় মাতৃভূমি আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রান্ত করতে চলেছে। ৭২ বছরের পথ-পরিক্রমায় বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া আওয়ামী লীগ কেবল সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলই নয়, এই দলের ব্যানারেই পাকিস্তান ভেঙে স্বতন্ত্র স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে যেমন বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে; তেমনি পশ্চাৎপদতা, দারিদ্র্য ও পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু যেমন জাতি-রাষ্ট্রের নির্মাতা তেমনি তারই কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার নির্মাতা।
আজকের এই দিনে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করব সেই সব ত্যাগী ও নিষ্ঠাবান নেতা-কর্মীদের, যাদের রক্ত, স্বেদ ও আত্মত্যাগে বাংলাদেশ আজ সারা দুনিয়ায় অভিনব নজির স্থাপন করেছে। এই ৭২ বছরের পথ-পরিক্রমায় অগণিত নেতা-কর্মী ও সমর্থক তাদের জীবন দিয়ে একদিকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রামে নতুন নতুন সাফল্য বয়ে আনছেন। আমরা এই দিনে প্রিয় দেশবাসীকে অভিনন্দন ও জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply