মাছের দেশ বাংলাদেশে; মুজিববর্ষে সম্ভাবনাময় সুবর্ণ রুই

ড. রাজিয়া সুলতানা
আজ সর্বজন স্বীকৃত যে করোনার মতো বৈশ্বিক দুর্যোগে প্রাণীজ আমিষের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে প্রাণীজ আমিষের প্রধানতম উৎসই মাছ। মৎস্যবিজ্ঞান বলছে, মাছের ২০ শতাংশই আমিষ। তাছাড়া মাছের উপযোগী প্রার্চুযতাও বেশি। মাছে-ভাতে বাঙালির স্বভাব পুরনো। তাই মাছের সাথে বাঙালির প্রাণের সম্পর্ক।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে পুকুর, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড় সংখ্যার শেষ নেই। সব মুক্ত জলাশয়ে রয়েছে অফুরন্ত মাছ। অন্যদিকে কৃষিবান্ধব সরকারের চৌকস মৎস্যবিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত জেনেটিক ব্রিডিং অব্যাহত রেখেছেন। ফলে নিত্যনতুন প্রজাতির মাছ সংযোজন হচ্ছে মৎস্য ভাণ্ডারে। মাছে সমৃদ্ধ বাঙালি জাতি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট অবমুক্ত করেছে রুই মাছের এক নতুন প্রজাতি। যার নাম ‘সুবর্ণ রুই’। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে অ্যালবামে ধরে রাখতে এই প্রয়াস। মৎস্যবিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, এই জাতের রুই মাছ পূর্বতন সব জাত থেকে দ্রুত বর্ধনশীল, অধিক উৎপাদনশীল, সুস্বাদু এবং দেখতে আকর্ষণীয় ও লালচে। এক কথায় মাছটি শুধু স্বাদের খনিই নয়, সুস্বাস্থ্যেরও চাবিকাঠি। আবার ব্যবসায়িকভাবে সফলতম হবে বলেই বিশ্বাস।
উল্লেখ্য, গত ১০ জুন ২০২১ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব রওনক মাহমুদ আনুষ্ঠানিকভাবে এই ‘সুবর্ণ রুই’ মৎস্য অধিদপ্তর ও কয়েকজন হ্যাচারির মালিকদের কাছে অবমুক্ত করেন। ‘সুবর্ণ রুই’ নামকরণের ফলে চাষি, হ্যাচারি মালিক এবং দেশের মানুষের কাছে নতুন এই জাতের মাছটি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তা দ্রুত সম্প্রসারিত হবে বলে মনে করছেন আধিকারিকরা। অনুষ্ঠানে বিএফআরআই মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, উন্নতজাতের চতুর্থ প্রজন্মের ‘সুবর্ণ রুই’ মাছ স্বাদু পানি ও আধা-লবণাক্ত পানির পুকুর, বিল, বাঁওড় এবং হাওড়ে চাষ করা যাবে। এই জাতের রেণু পোনা হ্যাচারি থেকে সংগ্রহ করে নার্সারি ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন করে অনেকেই লাভবান হতে পারবেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের প্রাক্কালে অবমুক্ত করায় এর নাম দিয়েছি ‘সুবর্ণ রুই’।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেছেন, মাছ চাষের কারণে গত তিন দশকে দেশে মোট উৎপাদন বেড়েছে ছয় গুণ। আমরা নদী ও জলাশয়ে মাছের পরিমাণ এবং তার কতটুকু আহরণ করা যাবে, তা নিয়ে গবেষণা করছি। আমাদের বিজ্ঞানীরা শুধু রুইই নয়, কাতলা, কই, তেলাপিয়া, কালবাউশ ও সরপুঁটিসহ দেশের বিলুপ্তপ্রায় ২৪টি প্রজাতির মাছের উন্নত উৎপাদন পদ্ধতি এবং উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী থেকে ২০২০ সালে রেকর্ড ২৫৭৭১.৪০ কেজি রুই মাছের ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯৮.২২ কেজি রেণু উৎপাদিত হয়েছে, যা কার্প জাতীয় মাছের উৎপাদনে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষে হালদাকে ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ’ ঘোষণা করেছিল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি হালদা নদীকে সংরক্ষণ ও সুরক্ষা প্রদানের জন্য সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
সুবর্ণ রুইয়ে আমিষ ছাড়াও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অন্যান্য পুষ্টিগুণও। তবে ক্যালরির পরিমাণ কম। তাই এই মাছটি সবার জন্যই স্বাস্থ্যকর হিসেবেই ভূমিকা রাখবে। এই মাছের তেলে রয়েছে ওমেগা-৩ এবং ফ্যাটি এসিড, যা মস্তিষ্কের প্রধানতম খাদ্য। আছে প্রচুর ভিটামিন ও খনিজ লবণ। আরও রয়েছে খনিজ তেল, চর্বি, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস। সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে প্রতি ১০০ গ্রাম রুই মাছে রয়েছে ১৬.৪ গ্রাম আমিষ, ১.৪ গ্রাম চর্বি, ৬৮০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম এবং ২২৩ মিলিগ্রাম ফসফরাস।
বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে বহুল পরিচিত এবং পছন্দের অন্যতম একটি মাছ রুই। কিন্তু সারাবিশ্বে রোহু নামে পরিচিত। আরও অনেক নাম রয়েছে এই মাছটির। যেমনÑ রোহিতা, রুহিত, রাউ, নলা, গরমা, নওসি। রুই মাছ মূলত বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও মিয়ানমারের নদীতন্ত্রের প্রাকৃতিক প্রজাতি। মিষ্টি পানির পুকুর, নদী, হ্রদ ও মোহনায় এই মাছ পাওয়া যায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ছোট-বড় নদী, পুকুরসহ মুক্ত জলাশয়ে এরা বিচরণ করে। তবে ডিম ছাড়ার সময় সব মাছের মতোই রুইও প্লাবন অঞ্চলে প্রবেশ করে। তবে সফলভাবে চাষ করা যায় বদ্ধ জলাশয়ে। সম্প্রতি অনেকেই বিভিন্ন প্রজাতির চাষ করে জীবন-জীবিকা পরিচালনা করছেন। হচ্ছেন যথেষ্ট লাভবানও। সুস্বাদু রুই মাছের চাষ পদ্ধতিও সহজ। রুইয়ের রয়েছে ব্যাপক অর্থনৈতিক গুরুত্বও। পুষ্টি ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশ, রাশিয়া, শ্রীলংকা, চীন, জাপান, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া এবং আফ্রিকান দেশগুলোতে রুই মাছের ব্যাপক চাষ হচ্ছে। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের মিষ্টি পানির নদীতেও অনুপ্রবেশিত রুইয়ের সফল চাষ হচ্ছে।
রুই সাধারণত নদী বা মুক্ত জলাশয়ের মাছ। স্রোতযুক্ত স্থানে মা মাছ ডিম ছাড়ে আর সে-সময় বাবা মাছ সেই ডিমের ওপর শুক্রাণু ছাড়তে থাকে। অতঃপর ডিম নিষিক্ত হয়। কিন্তু যখন বদ্ধ জলাশয়ে এই মাছ চাষ করা হয়, তখনই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে। ফলে কাক্সিক্ষত উৎপাদন পাওয়া যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎপাদিত রুই মাছের জেনেটিক অবক্ষয়ও হয়। তাছাড়া ইনব্রিডিং বা অন্তঃপ্রজননজনিত সমস্যার কারণে মাছের বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়। ফলে উৎপাদন কমে যায়। তাই মৎস্যবিজ্ঞানীরা সে-কথা মনে রেখেই সুবর্ণ রুই অবমুক্ত করেছেন। এই রুই মাছের জাত উন্নত। বাণিজ্যিকভাবে এই রুই উৎপাদন অনেকটাই ঝুঁকিহীন এবং লাভজনক হবে।
বিজ্ঞানীরা ধাপে ধাপে বাণিজ্যিকভাবে রুইয়ের উৎপাদন নিয়ে কাজ করেছেন। তারা প্রথম সফলতা পেয়েছেন ২০০৯ সালে। কিন্তু কাক্সিক্ষত মাত্রায় তারা উৎপাদন দেখাতে পারেননি। পরবর্তীতে রুই নিয়ে আরও কাজ করেছেন তারা। অবশেষে দীর্ঘ ১২ বছর পর এসেছে সেই গৌরবের সাফল্য। ২০২০ সালে বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন আরও দুটি জাত। অর্থাৎ ‘সুর্বণ রুই’ হলো চতুর্থ প্রজন্মের জাত। আনুষ্ঠানিকভাবে জাতটি অবমুক্ত করা হয়েছে স্বাধীনতার সুর্বণজয়ন্তীতে, ২০২১ সালের ১০ জুন।
রুই মাছের জাত উন্নয়নে মৎস্যবিজ্ঞানীরা হ্যাচারির পোনার ওপর নির্ভর না করে পূর্ণাঙ্গ রুই মাছ সংগ্রহ করেছেন হালদা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদী হতে। এরপর এদের মধ্যে সংকর বা ক্রসিং করেছেন। তবে ক্রসিংয়ের আগে প্রথমে তিন নদীর মাছের মধ্যে ৯টি গ্রুপ করা হয়। ওই গ্রুপ থেকে দ্বৈত অ্যালিল ক্রসিংয়ের মাধ্যমে প্রথমে বেইজ পপুলেশন তৈরি করেছেন। পরে বেইজ পপুলেশন থেকে সিলেক্টিভ ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে রুই মাছের প্রথম জাত তৈরি করেছেন। পরবর্তীতে একই ধারাবাহিকতায় উদ্ভাবন করেছেন রুইয়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয় জাত দুটি। সবশেষে চূড়ান্ত সাফল্য পেয়েছেন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে ২০২০ সালে। প্রথম জাতটি বেইজ পপুলেশন হতে ৭.৫ শতাংশ অধিক উৎপাদনশীল, দ্বিতীয় জাত ১২.৩৮ শতাংশ, তৃতীয়জাত ১৬.৮৩ শতাংশ এবং বর্তমান সুবর্ণ রুই ২০.১২ শতাংশ অধিক উৎপাদনশীল।
মৎস্যবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন সুবর্ণ রুই মাছ স্বাদু পানি ও আধা লবণাক্ত পানিতেও চাষ করা যাবে। মাছ চাষের জন্য প্রথমে পুকুর নির্বাচন করতে হবে। চাষের পুকুর নির্বাচনে লক্ষ রাখতে হবে পুকুর যেন নিজস্ব মালিকানাধীন হয়। তবে লিজ নেওয়া পুকুর হলে তা ন্যূনতম পাঁচ বছরের জন্য হতে হবে। পুকুর বন্যামুক্ত হতে হবে। পুকুর পাড় উঁচু ও মজবুত হতে হবে। পুকুরে ছায়া সৃষ্টি করতে পারে কিংবা পাতা পানিতে পড়ে পানি নষ্ট করতে পারে এমন কোনো গাছপালা পুকুরপাড়ে থাকা যাবে না। পুকুরে যথেষ্ট আলো-বাতাসের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পুকুরের তলদেশে ৪-৬ ইঞ্চির বেশি কাঁদা থাকা যাবে না। ব্যবস্থাপনা সুবিধার জন্য পুকুর আয়তকার হলে ভালো হবে। পুকুরের আয়তন ২০-৫০ শতাংশের মধ্যে হলে ব্যবস্থাপনা করতে সুবিধা হয়। তবে পুকুরের আয়তন ১০০ শতাংশের বেশি হওয়া যাবে না। পুকুরের গড় গভীরতা ৪.৫-৫.৫ ফুট হলে ভালো হয়। দোআঁশ এবং বেলে দোআঁশ মাটির পুকুর সবচেয়ে ভালো। এঁটেল মাটির পুকুরের পানি ঘোলা থাকে, ফলে সূর্যের আলো কম প্রবেশ করে এবং প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন কম হয়। বেলে মাটির পুকুরে পানি ও পুষ্টির অপচয় বেশি হয়। এছাড়াও মাটি ও পানির গুণাগুণও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মাটির পিএইচ হতে হবে ৬.৫-৭.৫, জৈব কার্বন ১.৫-২.৫ শতাংশ, জৈব পদার্থ ২.৫-৪.৫ শতাংশ, নাইট্রোজেন ৫০-৭৫ (মিলিগ্রাম/১০০ গ্রাম), ফসফরাস ১০-১২ (মিলিগ্রাম/১০০ গ্রাম), পটাসিয়াম ৩-৪ (মিলিগ্রাম/১০০ গ্রাম), ক্যালসিয়াম ৩০-৪০ (মিলিগ্রাম/১০০ গ্রাম)। পানির পিএইচ ৭-৯, তাপমাত্রা ২৮-৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, অক্সিজেন ৫-৭ পিপিএম, লবণাক্ততা ০-৪ পিপিটি, ঘোলাত্ব ০, খরতা ৪০-২০০ পিপিএম। সঠিকভাবে পুকুর তৈরি করে মৎস্য অধিদপ্তর বা বেসরকারি পর্যায়ে হ্যাচারি হতে উৎপাদিত রেণু বা পোনা সংগ্রহ করে পরিমাণমতো পুকুরে ছাড়তে হবে। প্রথমে এই পোনার সঠিকভাবে যতœ নিয়ে ব্রড মাছ তৈরি করতে হবে। পরে এই ব্রড মাছ হতে পোনা উৎপাদন করতে হবে। এই উৎপাদিত পোনা সমগ্র বাংলাদেশে ব্যবহার করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে সুবর্ণ রুই মাছের পোনা সরাসরি মৎস্য ইনস্ট্রিটিউট হতে ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা ও প্রতিবন্ধীদের মধ্যেও বিতরণ করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে এই মাছ উৎপাদন সম্প্রসারণ হলে বছরে প্রায় ৮০ হাজার কেজি মাছ বেশি উৎপাদিত হবে। যার বাজার মূল্য হবে কম-বেশি ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। বর্তমানে কৃষি জিডিপির এক-চর্তুথাংশেরও বেশি আসে মৎস্য খাত হতে। সুবর্ণ রুই যখন সফলভাবে প্রান্তিক পর্যায়ে চাষাবাদ করা যাবে, তখন মৎস্য খাত জিডিপিতে আরও অধিক অবদান রাখবে।
দেশের মানুষের চাহিদা মিটিয়ে রুইসহ অন্যান্য মাছ আজ রপ্তানি হচ্ছে দেশের পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, বাংলাদেশ মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করছে বিশ্বের ৫০টিরও অধিক দেশে। দেশসমূহ হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশসমূহ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, রাশিয়া, চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অ্যাংগোলা, বাহরাইন, কানাডা, হংকং, জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া, নেপাল, মেক্সিকো, মালদ্বীপ, কুয়েত, মরক্কো, সিঙ্গাপুর, কাতার, মরিসাস, মিয়ানমার, ইউক্রেন। তবে এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশসমূহ বাংলাদেশের মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্যের প্রধান বাজার।
বর্তমান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় মৎস্য খাত আজ দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। নতুন সংযোজন সুবর্ণ রুই মৎস্য খাতকে আরও সমৃদ্ধ করল। আমরা আশা করছি, ‘সুবর্ণ রুই’ মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করে চাষিদের মুখে হাসি ফুটাবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সুবর্ণ রুই দেশের জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি।
বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, গাজীপুর, বগুড়া ও কুমিল্লা জেলায় পুকুরে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে ঘেরে মাছ চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে। মাছ রপ্তানি বেড়েছে ১০ গুণ। দেশে মোট কৃষিজ আয়ের ২৪ শতাংশের বেশি অবদান মৎস্য খাতে। মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, এতে সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন চীনকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থানে পৌঁছে যাবে বাংলাদেশ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সর্বশেষ ‘দ্য স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকোয়াকালচার-২০২০’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- মৎস্য উৎপাদন ও আহরণে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে। স্বাদু পানির মাছের উৎপাদনে তৃতীয় স্থানে ও বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম। তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ এবং এশিয়ার মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। এফএও বলেছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বের যে ৪টি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে বাংলাদেশকে শীর্ষদেশ ভাবা হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত ১০ বছরে মাছের উৎপাদন ৫৩ শতাংশ বেড়েছে। আর মাছ রপ্তানি বেড়েছে ২০ শতাংশের বেশি। করোনা মহামারিতে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে আর্থিক মন্দাবস্থা থাকা সত্ত্বেও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭০,৯৪৫.৩৯ মেট্টিক টন মাছ ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এই রপ্তানি থেকে আয় করেছে ৩,৯৮৫.১৫ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।
সরকার মাছ রপ্তানি করে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আয় করছে। চিংড়ি এখন দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি পণ্য। দেশে প্রায় পৌনে ২ কোটি মানুষ মৎস্য সংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিত। এর মধ্যে বেকার তরুণ মাছ চাষে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন। মৎস্যবিজ্ঞানীদের ধারণা সুবর্ণ রুই ঠিকঠাক প্রজনন ও উপাদন হলে বাংলাদেশ মৎস্য খ্যাতে নতুন মাইলফলক সৃষ্টি করবে।

লেখক : শিক্ষক; পিএইচডি গবেষক, প্ল্যান্ট প্যাথলজি
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা নগর, ঢাকা
raziasultana.sau52@gmail.com

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply