ইউরো-কোপায় ফুটবলবিশ্ব উৎসবমুখর; গ্যালারিতে চিরায়ত দর্শক উন্মদনা

আরিফ সোহেল

ফুটবলপ্রেমীদের করোনা নিয়ে ভাবনার লেশমাত্র নেই। ইউরো কাপে দর্শকদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া গেছে স্বাভাবিক-সাবলীল উন্মাদনা। ধ্বণিত হয়েছে সেই উচ্ছ্বাস, আবেগ প্রকাশের চিরায়ত ছবি, বর্ণিল পোশাক, আফসোস, কান্নায় ভেঙে পড়া- সবটাই ছিল এবার ইউরো ফুটবলে। ফুটবলে যেন ফিরে ফিফা বিশ্বকাপ। দর্শক না থাকলেও মেসি-নেইমারদের কোপা আমেরিকায় স্যাটেলাইটে রঙ ছড়াচ্ছে অবিরাম।

২০২২ সালের শেষভাগে কাতারের বসবে ২২তম আসর। বিশ্বকাপের আগে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ ও কোপা আমেরিকার ফুটবলকে ঘিরে উৎসবমুখর আমেজ বাতাসে অফুরন্ত সৌরভ ছড়াচ্ছে। অথচ করোনা আগ্রাসন চলছেই। ফুটবলপ্রেমীদের করেনা নিয়ে যে মাথা ব্যথা নেই তা দেখার বাকি নেই। গত বছর করোনার ভয় সরিয়ে নিয়মিতই হচ্ছে সব ধরনের ফুটবল টুর্নামেন্ট। তারই ধারাবাহিকতায় একযোগে চলছে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম দুটি জনপ্রিয় আসর ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ ও কোপা আমেরিকা। অনেক নাটকীয়তার পর এবারের ৪৭তম কোপা আসর হচ্ছে পেলের দেশ ব্রাজিলে। আর ১১ শহরে চলছে ১৬তম ইউরোর আসর।
ইউরো মানে ইউরোপের বিশ্বকাপ। আর কোপা হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার বিশ্বকাপ। মেসি-নেইমারদের আসর বিশ্ব ফুটবলের প্রাচীনতম মহাযজ্ঞ হলেও খেলার মান, জনপ্রিয়তা, উত্তেজনায় কোপাকে সব সময়ই ছাড়িয়ে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ। বিশ্বকাপে খেলা অনেক দলই ইউরোতে বাছাই খেলতে হলে বাদ পড়ে যেত। সেই তুলনায় কোপা আমেরিকা অনেকটাই সহজতর। তবে বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা থাকায় কোপা নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই। ইউরোপের সেরা শক্তিগুলোর সেরা শিল্পিত কলাকৌশল আর পাওয়ার ফুটবলের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে এবারের আসরে। তাই বিশ্বকাপ ফুটবলের পরেই মূল্যায়ন করা হয় ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপকে। এখানে সব একই মানের দল অংশগ্রহণ করে। এখানকার দলগুলোর মান প্রায় ১৯-২০। বিশ্বকাপে ভারসাম্যের অভাব লক্ষ করা যায়। অঞ্চলভিত্তিক কোটা থাকায় অনেক দুর্বল দলও বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়। ইউরোতে সে সুযোগ নেই।

গ্রুপ পর্ব তো বটেই, ইউরোর সদ্য শেষ হওয়া প্রি-কোয়ার্টার এবং কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিটি ম্যাচই ছিল উত্তেজনায় ঠাসা। ইউরো থেকে ইতোমধ্যেই বিদায়ঘণ্টা বেজেছে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, বিশ্বকাপের বর্তমান রানার্সআপ ক্রোয়েশিয়া, সুইজারল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, ইউরোর বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল ও চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানি, র‌্যাংকিংয়ের অন্যতম সেরা বেলজিয়ামের মতো বড় দলের। তবে সেমিফাইনাল অবধি দুরন্ত ফর্মে রয়েছে ইতালি ও ইংল্যান্ড। নতুন এক ইংল্যান্ডকেদেখতে পাচ্ছে ফুটবল বিশ্ব। তবে দুইবারের চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে অনবদ্য মনে হচ্ছে এ যাবৎ।

ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের গল্প
ফুটবল ইতিহাস জানাচ্ছে ১৯৬০ সালে শুরু হয় ইউরোপিয়ান নেশনস কাপ। দুই আসরের পরই ১৯৬৮ সালে এই টুর্নামেন্টের নাম পরিবর্তন হয়। রাখা হয় ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ বা ইউরো কাপ। এর আগে স্বাগতিক দেশে এই আসরের আয়োজন হয়েছে। কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম ঘটেছে করোনার কারণে। ৬০ বছরের ইতিহাস পাল্টে গেছে এবার। উল্লেখ্য, ২০২০ সালে করোনা অতিমারির জেরে এই ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে পারেনি উয়েফা। এটা অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২০২১ সালে। ১২ জুন, সূচনা ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ইতালি ও তুরস্ক।
এবারের ইউরো আগেরগুলোর চেয়ে বেশ ব্যতিক্রমী। সাধারণত এসব বড় টুর্নামেন্ট একটি কিংবা বড়জোড় দু-তিনটি দেশ মিলে আয়োজন করে থাকে। কিন্তু এবারের আসর বসছে ১১টি দেশ মিলিয়ে। সঙ্গে দর্শকরাও ফিরছেন মাঠে। ইউরো ২০২০-এর মাসকট হিসেবে রয়েছে ‘স্কিলজি’। ফ্রি-স্টাইল ফুটবলার এবং স্ট্রিট ফুটবলারদের অনুপ্রেরণা থেকে তৈরি করা হয়েছে স্কিলজিকে।
এবারের ১৬তম ইউরোতে অংশ নিয়েছে ২৪টি দল। গ্রুপ ‘এ’তে খেলেছে ইতালি, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক এবং ওয়েলস। গ্রুপ ‘বি’তে খেলেছে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড এবং রাশিয়া। গ্রুপ ‘সি’তে নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া, ইউক্রেনের সঙ্গী ছিল নর্থ মেসিডোনিয়া। গ্রুপ ‘ডি’তে ইংল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, স্কটল্যান্ডের সঙ্গে ছিল চেক প্রজাতন্ত্র। গ্রুপ ‘ই’-এর দলগুলো ছিল স্পেন, সুইডেন, পোল্যান্ড ও সেøাভাকিয়া। আর ডেথ গ্রুপ হিসেবে খ্যাত ‘এফ’-এ ছিল ফ্রান্স, পর্তুগাল, জার্মানি এবং হাঙ্গেরি।
ইতালি, ডেনমার্ক, রাশিয়া, নেদারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, স্পেন, জার্মানি, হাঙ্গেরিÑ এই ৯টি দেশ রাউন্ড লিগের ম্যাচগুলেতে স্বাগতিক হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। এর বাইরে আজারবাইজান এবং রোমানিয়ায়ও ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জুনে শুরু হওয়া ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবল আসর ঘিরে মেতে ওঠার সুযোগ পেয়েছেন ফুটবলপ্রেমীরা। অনেকদিন পর জাতিতে জাতিতে ফুটবল- শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই দেখে মোহিত হচ্ছেন ফুটবলপাগল ভক্তরা। উপভোগ করছেন বিশ্বকাপের আদলে ফুটবল বিনোদন। আনন্দযজ্ঞে করোনার বাধো-বাধো ভাব এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে পুনোর্দ্যমে ইউরো ফিরেছে মাঠে। এক মাস ধরে ফুটবল উন্মাদনার সঙ্গে হাজারো হিসাব-নিকাশ আর জল্পনা-কল্পনা মিলানোর সুযোগ তারা হারাতে চাচ্ছেন না। দীর্ঘদিন পর স্বাদ মিলছে বড় ফুটবল টুর্নামেন্টের। ১১ ভেন্যুর ৫১ ম্যাচে ২৪ দলের এই লড়াইয়ের শেষ হাসির মঞ্চ ইংল্যান্ডের ফুটবল- তীর্থ ওয়েম্বলি। সেখানেই বিজয়মাল্য পরবে এবারের আসরের বিজয়ীরা। ততদিন অপেক্ষায় থাকতেই হচ্ছে দশর্কদের।
ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের কোয়ার্টার ফাইনালও শুরু হয়েছে ৩ জুলাই রাতে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে পেনাল্টি স্যুট আউটে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথম দল হিসেবে সেমিফাইনালে নাম লিখিয়েছে স্পেন। পরের ম্যাচে ইতালি ২-১ গোলের ব্যবধানে বেলজিয়ামকে হারিয়েছে নিশ্চিত করেছে শেষ চার। ৪ জুলাই রাত ১০টায় চেক প্রজাতন্ত্রকে ডেনমার্ক এবং রাত ১টায় শেষ কোয়ার্টারে ইউক্রেনকে উড়িয়ে দিয়েছে ইংল্যান্ড।
পুরো আসর বিশ্লেষণেদেখা গিয়েছে দুদার্ন্ত ফর্মে রয়েছে ইতালি। টানা ৩২ ম্যাচ জিতে তারা ৮০ বছরের পুরনো ইতিহাস ভেঙে দিয়েছে। প্রায় দুই বছর যাবত ইতালি অপরাজিত। সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে তারা বাঁচিয়ে রেখেছে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন। খেলছে দারুণ। টিমওয়ার্ক চোখে পড়ছে। শিরোপার দাবিদার তাদের মানতেই হবে।
একপেশে ম্যাচেও হারতে হারতে বেঁচে গেছে দুবারের ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন। প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ডের গোলরক্ষক যেন তাদের জন্য সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। একাই সব আক্রমণে পানি ঢেলে দিয়েছেন। অতিরিক্ত সময়ে খোলা ড্র ছিল। খেলা নিষ্পত্তি হয়েছে পেনাল্টিতে। সেখানে সোমের সতীর্থরা ব্যর্থ হয়েছে। সোম জিতলেও হেরেছে তার দল।

কোপা আমেরিকা নিয়ে অল্প কিছু
১৮১৬ সালে স্বাধীন হয়েছিল আর্জেন্টিনা। ১৯১৬ সালের ২ জুলাই আর্জেন্টিনায় বসেছিল এক জাঁকজমকপূর্ণ ফুটবলের আসর। আর্জেন্টিনার আমন্ত্রণে সেই টুর্নামেন্টে যোগ দিয়েছিল চিলি, উরুগুয়ে এবং ব্রাজিল। সেই আসর উত্তেজনা না ছড়ালেও বেশ প্রসংশিত হয়েছিল।
১৯১৬ সালের সেই টুর্নামেন্টটার নাম ছিল ‘কমপিওনাতো সুদামেরিকানো অব সেলেসিওনিস’, ইংরেজিতে মানে দাঁড়ায় সাউথ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ অব নেশন্স। মূলত এই আসরকে ধরা হয় কোপা আমেরিকার প্রথম আসর। ঠিক সে-সময়েই ১৯১৬ সালের ৯ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কনফেডারেসিওন সুদামেরিকানা দি ফুটবল কিংবা সাউথ আমেরিকান কনফেডারেশন অব সকার- কনমেবল। শুরুতে এই টুর্নামেন্টের নাম কোপা আমেরিকা ছিল না। এমনকি কনমেবল আয়োজিত এই টুর্নামেন্টের সব আসর তখন অফিসিয়ালও ছিল না। পুরাতন এই টুর্নামেন্টটি নতুন যুগে প্রবেশ করে ১৯৪৫ সালে। টুর্নামেন্টকে অফিসিয়ালি নিয়মিত করার একটা উদ্যোগ আসে আয়োজকদের মাথায়। তারপরও দীর্ঘপথ শেষে ১৯৭৫ সালে এই টুর্নামেন্টের সত্যিকারের জাগরণ ঘটেছিল। নবরূপে সূচনা যাত্রা করে কোপা আমেরিকা। তবে এই আসরে ছিল এক অদ্ভুত ফরমেট। ছিল অটো প্রমোশন প্রক্রিয়া। ১৯৭৫ সালে প্রথম আসরে উরুগুয়ে, ১৯৭৯ সালে পেরু, ১৯৮৩ সালে প্যারাগুয়ে, ১৯৮৭ সালে আবারও উরুগুয়েকে কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে অটো প্রমোশন দেওয়া হয়। কোপা আমেরিকার অদ্ভুতুড়ে ফরমেটটা বজায় ছিল ১৯৮৭ সালের আসর অবধি। তবে এই আসরে মানা হয়েছে বছর বিরতির হিসাব। প্রতি চার বছর পরপর এই আসর আয়োজন করা হয়েছিল। রাখা হয়েছিল নির্ধারিত সময়সীমাও। আগেও যেমন বছরের কয়েক মাস ধরে কোপা আমেরিকার ফুটবল আয়োজিত হতো। ১৯৯১-এর আসর থেকে কোপা আমেরিকার ফরমেট পাল্টে ফেলে নির্দিষ্ট ভেন্যুতে আসরটি অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু করে। অবশ্য নির্দিষ্ট ভেন্যুর বিষয়টি কোপা আমেরিকায় দেখা গেছে ১৯৮৭ সালে। সেবার টুর্নামেন্ট মাঠে গড়িয়েছিল আর্জেন্টিনাতে, তবে ফরমেট ছিল অদ্ভুতুড়ে। কোপা আমেরিকা টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু করে ১৯৮৭ সাল থেকে। তখন থেকেই কোপা আমেরিকা দক্ষিণ আমেরিকার বাইরেও একটা আলোড়ন তুলে ফেলে। ইউরোপে ১৯৮৭ সালের আসরটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা তৈরি করতে পেরেছিল। তখন থেকে কোপা আমেরিকা এভাবেই চলছে। তবে ২০১৬ সালের আসরে কোপা আমেরিকার ফরমেটে আরেকবার বদল আনা হয়, যদিও সেটা ওই এক আসরের জন্যই। মূলত কোপা আমেরিকার শতবর্ষ পালনের জন্য সেই আসরে কনকাকাফ থেকে ৬ দল নিয়ে কনমেবলের ১০ দলসহ মোট ১৬ দল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসে কোপা আমেরিকার শতবর্ষী আসর। সেই আসরকে অবশ্য স্পেশাল এডিশন অভিহিত করে ডাকা হয় কোপা আমেরিকা সেন্তেনারিও। তবে পরের আসর থেকেই আবার পুরনো ফরমেটে ফিরে যায় কোপা আমেরিকা।
একেবারে শিরোপা ছুঁই ছুঁই অবস্থানে পৌঁছে গেছে কোপা আমেরিকা। গ্রুপ পর্বের খেলা শেষ। শেষ কোপা আমেরিকার শেষ আটের লড়াইও। ‘এ’ গ্রুপ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলছে মেসির আর্জেন্টিনা। মেসিময় ম্যাচের মিলেছে দারুণ দর্শন। পায়ের জাদুর দেখানো মেসি এই আসরে দেখিয়েছেন বাহারি মুন্সিয়ানা। আর ‘বি’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলে নেইমারে ছিল চোখ ধাঁধানো নৈপুণ্য আর বাহারি ফুটবল।
কোপার ফরমেট অনেক সহজ। ১০ দলের আসরে দুই গ্রুপে খেলছে ৫টি করে দল। এখান থেকে মাত্র একটি করে দুটি দল বাদ যায়। বাকি ৮টি দলই উঠে এসেছিল কোয়ার্টার ফাইনালে। সেখানে প্রথম দল হিসেবে নাম লিখিয়েছে ব্রাজিল। ২ জুলাই রাত থেকে শুরু হচ্ছে সেমিফাইনাল। শেষ আটের প্রথম ম্যাচে খেলবে পেরু-প্যারাগুয়ে। বাংলাদেশ সময় ৪ জুলাই সকাল ৬টায় ব্রাজিল খেলবে চিলির বিপক্ষে। ওইদিন দিবাগত রাতে মুখোমুখি হবে উরুগুয়ে-কলম্বিয়া। আর ৫ জুলাই সকাল ৭টায় শেষ কোয়ার্টার ফাইনালে নামবে সুপারস্টার লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষ ইকুয়েডর।
কোপা আমেরিকায়ও বিপত্তি ঘটে যাচ্ছিল। তাই শেষ বাঁশি যখন বেজেছে তখন মনে হয়েছে নেইমাররা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন। ১০ জনের ব্রাজিল নিয়ে বেশ হাঁসফাঁস করতে ছিল পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। চিলির বিপক্ষে ম্যাচটির ফল ১-০। আর সেখানে গোলটি হয়েছিল দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই, ৪৬ মিনিটে। পরোক্ষণেই ৪৭ মিনিটেই ১০ জনের ব্রাজিলে পরিণত হয়। গ্যাব্রিয়েল জেসুস জঘন্যভাবে ফাউল করে লালকার্ড পেয়ে মাঠ ছেড়েছেন। তবে প্রথমার্ধে ব্রাজিল বেশ কয়টি গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। দ্বিতীয়ার্ধে চিলিও ব্যর্থ হয়েছে। অপর কোয়ার্টারে টাইব্রেকারে প্যারাগুয়েকে ৪-৩ গোলে সেমিফাইনালের টিকিট পেয়েছে গতবারের ফাইনালিস্ট পেরু। নির্ধারিত সময়ে রোমাঞ্চকর ম্যাচটি ৩-৩ গোলে অমীমাংসিত ছিল। এই ম্যাচেও লালকার্ডের মহড়া দেখেছে দর্শকরা।

ইউরো কোপার শেষ হিসেব
৬ জুলাই প্রথম সেমিফাইনালে খেলবে ব্রাজিল। প্রতিপক্ষ পেরু। ৭ জুলাই দ্বিতীয় সেমিফাইনালে কলম্বিয়াখেলবে মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। ১১ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে কোপা আমেরিকার ফাইনাল। এর আগে ৪ জুলাই আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে ইকুয়েডরকে উড়িয়ে দিয়েছে ৩-০ ব্যবধানে। যেখানে মেসির একক নৈপুণ্য ছিল চোখে পড়ার মতো। মেসি দল নিয়ে যেভাবে ছুটছেন তাতে এবার হয়তো জাতীয় জার্সি গায়ে তার ক্যারিয়ারের একমাত্র স্বপ্ন পূরণ হবে। দরকার মাত্র দুটি জয়। আছেন দুর্দান্ত ফর্মে। গোল করছেন নিজে; করাচ্ছেনও। একজন শতভাগ বিজয়ী অধিনায়কের মতোই দলকে লিড দিচ্ছেন মেসি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে কোনো শিরোপা জিততে পারেনি লিওনেল মেসি। ব্যর্থ হয়েছেন আগের ৯ বারের প্রচেষ্টায়। কী বিশ্বকাপ, কী স্থানীয় কোপা আমেরিকা। এবার দশম চেষ্টা চলছে মেসির।
অন্যদিকে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের পথপরিক্রমা প্রায় শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে। এখন চূড়ান্ত পরিণতির অপেক্ষায় ৪ দল। সেমিফাইনালের লাইনআপ ঠিকঠাক হয়ে গেছে। মুুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ড-ডেনমার্ক। অন্য সেমিফাইনালে ইতালির বড় বাধা স্পেন। তাদের দ্বৈরথ নিয়ে দর্শকদের বিপুল আগ্রহ। এর আগে শেষ কোয়ার্টার ফাইনালে কঠিন লড়াইয়ের পর বেলজিয়ামকে বিদায় করে দিয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালি। গতি-ছন্দ আর ফুটবল ঝংকারের এই ম্যাচটি রীতিমতো উপভোগ্য। ৩ জুলাই রাতে ইতালি ২-১ গোলের ব্যবধানে বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয় নিয়ে শেষ দল হিসেবে সেমিফাইনালের টিকিট কিনে নেয়।
প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানিকে হারিয়ে যেন ইংলিশরা শিরোপার পথটা রচনা করে ফেলেছে। তাই কোয়ার্টারে হ্যারি কেনের ইংল্যান্ড প্রতিপক্ষ ইউক্রেনকে পাত্তাই দেয়নি। গোলের ঠিকে গোল এঁকে তারা শেচচেঙ্কোর ইউক্রেনকে ৪-০ গোলে বড় ব্যবধানে গুঁড়িয়ে-মুড়িয়ে দিয়েছে। ৪ জুলাই ম্যাচটি ছিল একপেশে এবং ম্যাড়মেড়ে। ইংলিশদের গতিময় ফুটবলের ছন্দ-শৈল্পিক কারুকাজের কাছে ছিল একেবারেই অসহায়। ইংল্যান্ড ২৫ বছর পর এই আসরের শেষ চারে নাম লিখিয়েছে। ৭ ও ৮ জুলাই দুটি সেমিফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে। ফাইনাল ১১ জুলাই।
১৯৬৬-এর বিশ্বকাপ জেতার পর পেরিয়ে গেছে অর্ধশতাব্দীর বেশি। ফুটবলের বিশ্বের অন্যতম প্রধান দেশ হয়েও বৈশ্বিক বা মহাদেশীয় আসরে সাফল্যহীন ইংল্যান্ড। এবাব হয়তো হয়তো ‘ফুটবলের আতুর ঘরে’- ফিরতে পারে শিরোপার নবজোয়ার। ইউরো ও কোপা আমেরিকা ফুটবল ঘিরে ক্রীড়াঙ্গনের স্বপ্ন-রঙিন দিনগুলো যেনো ফিরে আসতে শুরু করেছে। জয় হোক ফুটবলের; জয়হোক ফুটবলপ্রিয় দর্শকদের, যারা করোনাকালেও ছুটে আসছেন প্রাণের গ্যালারিতে।

লেখক : সম্পাদকম-লীর সদস্য, উত্তরণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply