বিএনপির এলএসডি নামক মাদক খাওয়া প্রসঙ্গ

শেখর দত্ত 

‘সরকার যেন বিএনপিকে এলএসডি খাইয়ে দিয়েছে’, কথাগুলো বিগত এক মাস আগে ২৯ মে বলেছেন দলটির থিংক ট্যাঙ্ক বলে পরিচিত ও বর্তমানে সমালোচিত ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী। এলএসডি কি তা জানতামই না। কিন্তু ওই কথা বলার আগে জেনে নিয়েছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের এক ছাত্র ওই লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইড নামে মাদক খেয়ে মাতাল হয়ে এক ডাবওয়ালার দা দিয়ে নিজের গলা নিজেই কেটে মারা যাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার ভেতর দিয়ে। কারণ এই মাদক খেলে সাময়িক আনন্দ হয় এবং হ্যালুসিনেশন (অলীক কিছু দেখা) ও ইলুনেশন (উন্মত্ততা-বিচ্ছিন্নতা) দুটোই তৈরি হয়। ফলে যা খুশি তা করতে ইচ্ছে হয়। আত্মহননকারী ছাত্রটি অবশ্য বন্ধুরা মিলে ওই মাদক খেয়েছিল। কিন্তু ডাক্তার সাহেব বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপিকে ওই মাদক খাইয়ে দিয়েছে। অবশ্য ট্যাবলেট-ক্যাপসুল না-কি তরল এলএসডি খাইয়ে দিয়েছে, তা তিনি বলেননি।
অতিকথনে পটু ডাক্তার সাহেবকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, ‘পাগল ও শিশু’কে ছাড়া আর কাউকে কি কেউ কিছু খাইয়ে দিতে পারে! জেনে-শুনেই বিষ পান করতে হয়। প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি শিশু দল? মোটেও না। অবশ্য বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যার পর প্রত্যক্ষ সামরিক শাসনামলে ক্ষমতার ঔরসে জন্ম নেওয়া বিএনপি দলটি শিশু অবস্থায় ছিল ক্যান্টনমেন্টে। দলটি এখন পরিণত, বয়স হয়েছে ৪৫ বছর। ক্ষমতায় থেকেছে ১৬ বছর। ক্ষমতার এক কেন্দ্র থেকে আরেক কেন্দ্র হাওয়া ভবন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। কেরোসিনকে জেট ফুয়েল বানানো, বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপরীতে ‘খাম্বা’ বসানো কিংবা বোমা-গ্রেনেড দিয়ে ‘বাংলাভাই’দের নামাতে পারা প্রভৃতি তো আর শিশুরা পারে না। সেয়ানা বয়স লাগে।
আর পাগল বিএনপি আদৌ নয়। তবে ক্ষমতার অন্ধ মোহে পাগল হওয়ার বায়োডাটা বিএনপির রয়েছে। নতুবা জিয়া আমলে রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়া যাবে না বলেছিল কীভাবে! জিয়াকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বলা কিংবা শোক দিবস ১৫ আগস্টকে খালেদা জিয়ার জন্মদিন বানতে চাইতে কি পাগল ছাড়া কেউ পারে! আসলে ‘পাগল ও শিশু’ আদৌ নয় বিএনপি। জাতে মাতাল তালে ঠিক। এই তালবিরোধী দলে থাকলে বেসুরো ঠেকে; কিন্তু ক্ষমতায় গেলে ‘সৎ লোকেদের পার্টির’ সাথে মিলে তালটা বেশ জমে। বাস্তবে বিএনপি এলএসডি খাক বা না-খাক, ঝোপ বুঝে কোপ মারার জন্য অতীতের মতোই ঘাপটি মেরে বসে আছে। যেমন তাহেরের ‘সিপাহী বিদ্রোহের’ আশায় বসেছিলেন গৃহবন্দি জিয়া কিংবা শা-ল-সা সরকারের জন্য চাতক পাখির মতো তাকিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।
কিন্তু বারবার তো আর ঘুঘু ধান খেয়ে পার পেয়ে যেতে পারে না। এবার ফাঁটা বাঁশের চিপায় আটকে গেছে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ফাঁটা বাঁশ সৃষ্টি করেছে দলটিই। কাঁচা বয়সে পেকে যাওয়া, লেখাপড়া ও রাজনীতির কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়া যেদিন বিএনপি জিয়া-খালেদার ‘সুযোগ্য পুত্র’ (!) তারেক রহমানকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করেছে, সেদিনই বাঁশের চারা রোপিত হয়। আর এক নম্বর ভাইস প্রেসিডেন্ট করে বাঁশকে পোক্ত করেছে। সবশেষে ক্ষমতার প্যারালাল কেন্দ্র ‘হাওয়া ভবন’-এর নায়ককে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রজেকটেড করে বাঁশকে দ্বিখণ্ডিত করেছে। ‘টু ইন ওয়ান’ রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে সামনে রেখে যদি ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ সফল করতে পারতেন এই ‘তরুণ তুর্ক’, তবে বাঁশ পুরোটা কর্তন করতে সক্ষম হতো।
তাতে গাছেরটা যেমন-তেমন তলারটাও লুটেপুটে খেতে পারত বিএনপি। কিন্তু বিধি বাম! আন্দোলন-সংগ্রামের পরিণতিতে ১/১১-এর আর্মি ও নিরপেক্ষ-সুশীলদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেই গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছে। তাই সামান্য কাঁটা বাঁশটাই ফাঁটা বাঁশ হয়ে গেছে এবং তাতে আটকে গেছে বিএনপি। ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়ে দিচ্ছে, ফাঁটা বাঁশটা নিজেদের আটকা পড়ার জন্য তৈরি করেছে বিএনপির হালে এক নম্বর নেতা লন্ডন প্রবাসী তারেক রহমান। ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দিন সরকারের পিটুনি খেয়ে মুচলেকা দিয়ে জেলের ভয়ে দেশ ছেড়ে বেঁচে গেছেন তারেক রহমান; কিন্তু অকূলে ভাসিয়ে গেছেন মা খালেদা জিয়াকেই কেবল নয়, বিএনপির অসংখ্য নেতা-কর্মীদেরও। এমন ব্যক্তি কেবল বিএনপি দলটিরই নেতা হতে পারেন!
‘গণতন্ত্রের মা’ ও তারেক জিয়ার মা চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে ট্রাস্টের টাকা এদিক-সেদিক করে শাস্তি পাওয়ার পর থেকে সাড়ে তিন বছর ধরে তারেক জিয়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। সবাই জানে, কেবল নিজ দলের প্রবীণ নেতাদের কাছে কিংবা বিদেশিদের কাছেই কেবল নয়, এই নেতা দেশবাসীর কাছেও নিন্দিত ও ঘৃণিত। কথাটার সত্যতা ইনিয়ে-বিনিয়ে স্বীকারও করেছেন বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রথম আলো সাংবাদিকের কাছে ‘জ্যেষ্ঠ নেতাদের সাথে তারেক রহমানের মতের অমিল’ থাকাটা স্বীকার করে তিনি বলেছেন, ‘যাঁরা বেগম জিয়ার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন বা আগে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে থেকে রাজনীতি করেছেন, স্বাভাবিকভাবেই প্রথম দিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বটাকে মেনে নিতে তাদের একটু দ্বিধা হয়েছে।’
বলাই বাহুল্য, ‘হয়েছে’ জায়গায় ‘রয়েছে’ বললে ফখরুল ইসলাম সাহেব মহাসচিব পদ খোয়াতেন। তাই এরপর বলতে হয়েছে, দল এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে কেবল আরও ঐক্যবদ্ধই নয়; বরং এখন যৌথ নেতৃত্বে দল চলছে। কথাটা বাস্তবতার ধোপে টেকে না। ২০১৯ সালে তারেক রহমান একক সিদ্ধান্তে ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন করলে ছাত্রদলের বঞ্চিত নেতারা প্রতিবাদে নেমে বিএনপির অফিসে তালা লাগায়। তাতে ১২ ছাত্রদল নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। তারা ক্ষমা চেয়েছেন এবং স্থায়ী কমিটি তারেক রহমানকে অনুরোধ করেছে বহিষ্কারাদেশ তুলে নেওয়ার জন্য। কিন্তু তারেক রহমানের নির্দেশ না থাকায় তা তুলে নেওয়া হয়নি।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মোরশেদ খান পদত্যাগ করেছিলেন কেন? স্থায়ী কমিটিতে সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদকে একক সিদ্ধান্তে নিয়োগের পর বিএনপির নেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার কথা রাজনৈতিক অঙ্গনের কার না জানা! মির্জা আব্বাসকে শোকজ করা হলো কেন? এটা কার না জানা বিগত নির্বাচনে কেবল একক কর্তৃত্বে মনোনয়ন দেওয়ার জন্যই নয়, ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে ঐক্যজোট করা কিংবা প্রধানমন্ত্রীর সাথে নিঃশর্ত আলোচনা করা ছিল তারেক রহমানের একক সিদ্ধান্তের ফসল। এ নিয়ে আলোচনা না হওয়ায় বিএনপির ওপরে-নিচে ক্ষুব্ধ মনোভাব থাকার কথাও সবার জানা!
এ-কারণেই বাংলাদেশ ন্যাশনাল রিসার্চ অ্যান্ড কমিউনিকেশন আয়োজিত ২৮ জুন ভার্চুয়াল সভায় ‘বিদেশে থেকে তারেক রহমানের দল পরিচালনায় অসুবিধা হচ্ছে কিংবা এক এক নেতা এক এক কথা বলছে’ বিধায় দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে ‘লোকাল কমান্ডার’ করার দাবি উত্থাপিত হয়েছে। বলাই বাহুল্য, তারেক রহমানের ওপর জ্যেষ্ঠ বিএনপি নেতারাই নন, বিএনপির সাথে যুক্ত সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও বীতশ্রদ্ধ। এজন্যই ২৬ জুন প্রেসক্লাবে এডুকেশন রিফর্ম ইনেশিয়েটিভ আয়োজিত সভায় ডা. জাফরউল্লাহ বলতে পেরেছেন যে, ‘বিএনপির ক্ষমতায় আসার ইচ্ছা নেই। ইচ্ছা থাকলে পরিকল্পনা করতে হবে যে কী কী জায়গায় পরিবর্তন করতে হবে।’ পরিবর্তন মূলে কোথায় করতে হবে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেছেন, আজকে বিএনপি পরিচালিত হচ্ছে ওহি দিয়ে। সে ওহি আসে লন্ডন থেকে। পরিবর্তন আনতে হবে ঘর থেকে। আমি বারবার বলেছি, ‘তারেক দুই বছর চুপচাপ বসে থাক। পারো তো বিলেতে লেখাপড়ার সাথে যুক্ত হয়ে যাও। তারেককে লেখাপড়া করতে বলেছি।’
এ-কথা বলার পর সভায় উপস্থিত ছাত্রদল নেতারা ক্ষেপে গিয়ে বলেন, ‘আপনি বিএনপির কে? আপনি বিএনপিকে নিয়ে এত উল্টাপাল্টা বলেন কেন? আপনি আমাদের নেতাকে নিয়ে কখনও কথা বলবেন না।… পরবর্তী সময়ে কিছু হলে আমরা দায়ী নই।’ লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ-কথা বলার পর সভা ভেঙে যায়নি। চলেছে। বের হয়ে গেছে প্রতিবাদকারী ছাত্রনেতারা। এ থেকে অনুধাবন করা যায়, বিএনপির সাথে থিংক ট্যাংক বুদ্ধিজীবীদের বিচ্ছিন্নতা কোথায়? আর অভ্যন্তরে ধসটাই বা কোথায়? কোথায় আটকে আছে বিএনপি? তারেক জিয়া দলীয় প্রধান হিসেবে দলকে চাঙ্গা ও আন্দোলন শুরু করতে নিজের মতো করে ছাত্রদল যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করেছেন। বিভিন্ন জেলা কমিটি পুনর্গঠন করেছেন। কিন্তু বিএনপিতে স্থবিরতা, যাহা বায়ান্ন তাহাই তেপান্ন থেকে গেছে। তবে ফাটল বেড়েছে।
দল চাঙ্গা হয়নি। মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিএনপি মহল ও জনগণের মধ্যে কেবলই হা-হুতাশ বাড়ছে। হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে বহিষ্কার ও পদত্যাগে। বহিষ্কার করা হয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা সিলেটের শফী আহমেদ চৌধুরীকে। তৃণমূলে কত নেতা যে বহিষ্কার হচ্ছেন তার হিসাব রাখা কঠিন। সম্প্রতি নির্বাহী কমিটির সদস্য মেজর হানিফ ও কর্নেল শাহজাহান ব্যক্তিগত কারণ ও অসুস্থতার কথা বলে পদত্যাগ করেছেন। সাবেক উত্তরপাড়ার কর্তাব্যক্তিদের দল ছেড়ে দেওয়া ইঙ্গিতবহ। ইতোপূর্বে ডিসেম্বর ২০২১ সাবেক মন্ত্রী মেজর হাফিজ ও শওকত মাহমুদকে শোকজ নোটিস দেওয়াটাও এখানে স্মরণ করা যেতে পারে। কেবল সাংগঠনিক ক্ষেত্রেই হ-য-ব-র-ল অবস্থা নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও বিএনপি যেন দিক-নির্দেশহীন। ২০-দলীয় জোট এখন কোথায় আছে, কী করছে, তা কি কেউ বলতে পারবেন! ড. কামালের সঙ্গে ঐক্যেরই বা কি হলো? বিগত নির্বাচনে বিএনপি জিতলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা দলটি প্রজেক্ট করতে পারেনি। তেমনি কি এবারেও পারবে না! নেতা প্রজেক্ট করতে না পারলে সংসদীয় গণতন্ত্রের ফলাফল হয় অশ্বডিম্ব।
জানা যায়, ‘বোঝা’ বিবেচনায় দীর্ঘদিন ধরে জামাতের সঙ্গে জোটগত সম্পর্ক ছিন্ন করার পক্ষে বিএনপির অধিকাংশ স্থায়ী কমিটির সদস্য। এতদ্সত্ত্বেও বিষয়টি ‘ভাইয়ার’ মতামতের কারণে আটকে আছে। শরিক দল এলডিপি’র নেতা অলি আহমেদ স্বীকার করেছেন, ‘জোটের এখন কোনো কার্যক্রম নেই। বিভিন্ন কারণে বিএনপির পক্ষ থেকে কিছু সমস্যা হয়েছে।’ বাস্তবে সমস্যাটা কি সেটা জানাই সমস্যা। এটা কি জনমতের কারণে না-কি মুরব্বি পাকিস্তানের কারণে এটাও বলা শক্ত। রাজনৈতিক মহলে এমনটাই আলোচনা রয়েছে যে, আন্তর্জাতিক মুরুব্বি হারানোর ভয়ে বা নির্দেশেই বিএনপি সুনির্দিষ্ট লক্ষ ও আদর্শ নিয়ে গঠিত ২০-দলীয় জোটে জামাতকে রেখেছে। মূলত নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে বিএনপি দলের অবস্থা এখন এই প্রবাদের মতো হয়েছে যে, কাজীর গরু কাগজে আছে, গোয়ালে নাই। বক্তৃতা-বিবৃতিতে আছে, আন্দোলনে নেই।
বিধ্বস্ত বিএনপির চারদিক ঘিরে রয়েছে কুয়াশা আর হতাশা। তাই আষাঢ়ের তর্জন-গর্জনের মতো নেতারা রয়েছেন বিবৃতি-বক্তৃতার মধ্যে। নতুবা সব নেতাদের সাথে নিজেও যখন ঘুমিয়ে আছেন, তখন মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন কীভাবে ‘জনগণ জেগে উঠলে পালানোর পথ পাবে না।’ এ-কথা বলার আগে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তারেক রহমান কী কারণে পালাতে বাধ্য হলেন, কীভাবে দেশ থেকে গিয়ে লন্ডনে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, সে-প্রশ্নের উত্তর জনগণকে দেওয়া প্রয়োজন। জন্মের পর থেকে বিএনপি তিন সময়ে ক্ষমতায় গেছে। তিনবারই বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে পলায়নের ঘটনা ঘটেছে।
প্রথমবার নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সাত্তার মাথা নত করে গণভবন থেকে, দ্বিতীয়বার খালেদা জিয়া দ্রুততার সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সংবিধানে সন্নিবেশিত করে আর তৃতীয়বার বিএনপির সাংবিধানিক ‘পুতুল’ রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন মাথা নত করে গণভবন থেকে পালিয়ে বেঁচে গেছে। দেশের বারোটা বাজিয়ে পালানোর ইতিহাস আওয়ামী লীগের নেই। আছে স্বপক্ষের দল-গোষ্ঠী-ব্যক্তি-জনগণকে সাথে নিয়ে দেশ-জাতি-জনগণের জন্য লড়াই-সংগ্রাম ও বিজয়ের ইতিহাস। দেশে সম্পদের সীমাবদ্ধতা, জনসংখ্যার সংখ্যাধিক্য, ঔপনিবেশিক শাসনের পশ্চাৎপদতা, জন্মলগ্নের মর্মবাণী নিয়ে বিভক্ত রাজনীতি, জনগণের চেতনার সীমাবদ্ধতা, গণতান্ত্রিক চর্চা ও সংস্কৃতির অভাব, নৈতিকতার ক্রমাবনতি, অর্থনৈতিক-সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় উগ্রবাদীদের উগ্রতা-নাশকতা, আন্তর্জাতিক টানাপড়েন প্রভৃতির মধ্যেও দেশ আজ রয়েছে সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায়। বিএনপি-জামাত আমলের মতো বাংলাদেশের নাম এখন আর ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ কিংবা ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’র তালিকায় থাকে না।
বিপরীতে বিএনপি জন্মলগ্নের সূচনা থেকেই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের ভেতর দিয়ে একাত্তরের পরাজিত সব দল-ব্যক্তি-গোষ্ঠী-মহলকে নিজেদের দল ও জোটে সমবেত করে মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণী জাতীয় চার মূলনীতিসহ জাতির অর্জন ও সাফল্য থেকে দেশকে বিচ্যুত ও বিপথগামী করার পরিকল্পনা ও কর্মপন্থা গ্রহণ করে। বিএনপির অপকৌশল হচ্ছে, পরিস্থিতি ও প্রয়োজন বুঝে চালাকি করে মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য ব্যবহার করা। তারেক জিয়ার টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করার ঘটনা কিংবা জিয়ার সাথে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান প্রভৃতি এক্ষেত্রে স্মরণীয়।
চরম বিস্ময়ের বিষয় হলো, যে-দলটি ইতিহাসকে মিথ্যা ও বিকৃতভাবে উপস্থাপনের জন্য দায়ী, সে-দলটিই এখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের জন্য মায়াকান্না করছে। সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের রজতজয়ন্তী পালন উপলক্ষে ভার্চুয়াল সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইতিহাস বিকৃতির প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘আমরা দেখতে পাই, সরকার অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে স্বাধীনতার সত্য ইতিহাস বিকৃত করে তারা তাদের তৈরি ইতিহাস আজ জাতির সামনে, পরবর্তী প্রজন্মের সামনে নিয়ে আসছে।’ একদিকে এ-কথা বলছে আর অন্যদিকে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য নিজেদের সাবেক রাজনৈতিক অবস্থানে থেকে কথার ফুলঝুড়ি ছড়াচ্ছে।
প্রসঙ্গত, এবারেই বিএনপি ইতিহাসে প্রথম ঐতিহাসিক ৭ মার্চ পালন করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যায়িত করে বিএনপি নেতারা বলেন, ‘ভাষণটি সেই সময় সমগ্র জাতিকে উদ্দীপ্ত করেছিল।’ তবে বিএনপি অবশ্য এটা বলেনি, সমগ্র জাতির মধ্যে মেজর জিয়াও ছিলেন এবং ওই ভাষণ থেকে তিনি স্বাধীনতার জন্য ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেয়েছিলেন। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ওই সবুজ সংকেত স্ত্রী খালেদা জিয়া পাননি। তাই স্বামীকে একা ফেলে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে হানাদারকবলিত স্থানে চলে গিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আশ্রয়দাতা সেই হানাদার অফিসারের মৃত্যুতে কালো শাড়ি পরে পাকিস্তানের হাইকমিশনে গিয়ে আর শোক বইতে স্বাক্ষর করে তিনি তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তবে বাংলাদেশকে ললাটে কলঙ্কের কালি লেপ্টে দিয়েছেন।
সার্বিক বিচারে প্রশ্নটা হলো, বিএনপি একদিকে তারেক জিয়ার ‘আত্মার আত্মীয়’ জামাতকে সাথে রেখে আর অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্মলগ্নের ইতিহাস নিয়ে সময়ে সময়ে এ-ধরনের ডিগবাজি বা গোঁজামিলের খেলা চালিয়ে এবারেও কি পারবে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে? পারবে কি ‘হাওয়া ভবন’-এর দুর্নীতি-লুটপাট, দুঃশাসন-অপশাসন ও বোমা-গ্রেনেডবাজির অপরাধকে ঘাড় থেকে নামাতে? বিএনপি নেতাদের মুখে এখন আর ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ শহিদ জিয়া কথাটা উচ্চরিত হচ্ছে না। ‘গণতন্ত্রের মা’ খালেদা জিয়ার জন্মদিন এখন আর বিশাল বিশাল কেক কেটে পালিত হয় না। তারেক রহমানের বক্তৃতাও প্রচার করে না। এই লুকোচুরি খেলা জনগণ বুঝতে পারছে নাÑ এমনটা তো নয়। তাই বিএনপি মধ্য থেকে কথাটা উঠছে যে, বিএনপি আত্মবিস্মৃতিতে ভুগছে। বাস্তবে জিয়ার আদর্শেও নেই, বাংলাদেশের জন্মলগ্নের আদর্শেও নেই। না ঘরকা না ঘটকা হয়ে গেছে বিএনপি।
জনগণ এটাও বুঝতে পারছে, যে-দল দলীয় প্রধানের শাস্তি হওয়ার পরও আন্দোলনে রাস্তায় নামতে পারে না, সে-দলের ওপর আস্থা ও বিশ^াস রাখা আর তালপাতার সিপাইয়ের ওপর ভরসা করা একই ব্যাপার। খালেদা জিয়াকে জেল থেকে মুক্ত করার জন্য বিএনপির ‘লুকোচুরি মার্কা’ কৌশলও জনগণের কাছে দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট। পরিবারকে দলটি তদবিরে লাগিয়েছিল খালেদা জিয়াকে জেল থেকে মুক্ত করতে। চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারেও পরিবারই সরকারের কাছে তদবির করছিল। গত ২০ জুন দলের স্থায়ী কমিটির সভায় প্রথম দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
এরপর মহাসচিব ফখরুল বলেন, ‘এ বিষয়টি (দলের উদ্যোগ) এখন অন।’ সরকারের সাথে কেন্দ্রীয় নেতারা তদবিরের অফ ও অন-এর খেলা চালাবে আর বিএনপি নেতা-কর্মী-সমর্থকরা চাঙ্গা হবে, রাস্তায় নামবে, এই আশা সোনার পাথর বাটি ছাড়া আর কিছু নয়। বাস্তবে উল্লিখিত সব গোঁজামিল-ডিগবাজি, লুকোচুরি-অন-অফ খেলারই নামান্তর হচ্ছে ডা. জাফরউল্লাহ কথিত বিএনপির এলএসডি খাওয়া। এই মাদক খেতে থাকলে বিএনপিকে রক্ষা করবে কে? তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ছেলেটির মতো আত্মহননের পথেই বিএনপিকে যেতে হবে কি না কে জানে? স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী পালনের দিনগুলোতে এটাই রাজনীতির জ্বলন্ত প্রশ্ন।

লেখক : সম্পাদকম-লীর সদস্য, উত্তরণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply