দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিস্ময়

ড. জামালউদ্দিন আহমেদ এফসিএ: ঐতিহাসিকেরা এ ব্যাপারে একমত যে ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরাস্ত করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার কব্জা করার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সমগ্র ভারতবর্ষে তাদের থাবা বিস্তার করতে সক্ষম হয়। তারও আগে সমৃদ্ধ এই বাংলা জনপদে বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ইউরোপীয় অন্য বণিকদের হারিয়ে ব্রিটিশরা বাংলা ভূখ-ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের পথ সুপ্রশস্ত করে। মোটা দাগে আমরা যদি ১৭৫৭ সালে বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের পর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাবলির ওপর নজর দিই, তাতে দেখা যায়Ñ বর্তমান বাংলাদেশ ভূখ- ১৭৫৭-১৮৫৭ সময়কালে ব্রিটিশদের রাজত্বে ছিল। মঙ্গল পান্ডের সূচনা করা ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ নির্মমভাবে দমন করে ব্রিটিশরা ভারত উপমহাদেশে তাদের একক আধিপত্য নিশ্চিত করে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে ১৯১২ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর করা হয়। রাজধানী হিসেবে কলকাতার বিশেষ গুরুত্বের কারণে ব্রিটিশদের কর্মকা- কিছুটা বাংলায়ও প্রতিফলিত হয় বলে প্রতীয়মান হয়। প্রমাণস্বরূপ অনেকে উদাহরণ টানেন সিলেট-চট্টগ্রাম, কলকাতা-গোয়ালন্দ-কুষ্টিয়া এবং পদ্মা নদীর ওপর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের মতো রেলসেতু (১৯১৫) ইত্যাদি। দিল্লিতে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার রাজধানী স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের রাজনীতিতে বাংলার গুরুত্ব কমতে থাকে বলে অনেকে মত প্রকাশ করেন। এমনই এক প্রেক্ষাপটে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমানের পরিবারে জন্ম নেন আধুনিক বাংলার পুনর্জাগরণের মহানায়ক বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর জন্ম এমন এক ক্রান্তিলগ্নে, যখন ব্রিটিশদের শাসন-শোষণে নিষ্পেষিত ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শক্তিবিরোধী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছে। ১৮৮৫ সালে বোম্বাইয়ে প্রতিষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস, ১৯০৬ সালে ঢাকায় আত্মপ্রকাশ করা অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ এবং অন্যান্য দল ও গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ক্রমশই তীব্র রূপ নিতে থাকে। আর এমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ, ১৯২০-৪৭ সময়কালে তিনি ছিলেন ছাত্র ও টগবগে যুবকÑ অর্থাৎ জীবনকে উপলব্ধি করার শ্রেষ্ঠ সময়Ñ আর সেই সত্যোপলব্ধি তাকে কালের পরিক্রমায় এই বঙ্গ ভূখ-ের বাঙালি সন্তানদের ‘বন্ধু থেকে বাঙালি জাতির জনক’-এর আসনে বসিয়েছে; এমনকি তাকে হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালিরও মর্যাদা দিয়েছে। তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন খুব কাছ থেকে দেখেছেন। দেখেছেন ব্রিটিশদের শোষণের চরম রূপ আর ধর্মীয় বিভাজন উসকে দেওয়ার চূড়ান্ত রূপকেও। আর সে-কারণেই হয়তো তিনি আমৃত্যু শোষিতের পাশে থেকেছেন।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থেকে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়াশোনা ও রাজনীতির দীক্ষা নিয়েছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু কলকাতার সঙ্গে খুব অল্প বয়সে গভীর সংযোগ গড়ে ওঠার ফলে পরবর্তী সময়ে ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের কাঠামোতে ধন-সম্পদ-শিল্প-সংস্কৃতিতে বিশ্বব্যাপী মর্যাদার আসনে থাকা এই জনপদের বাঙালিদের যে শোষণ-বঞ্চনার অবসান হবে না; ফিরেও পাওয়া যাবে না লুপ্ত মর্যাদাÑ তা তিনি ভালোই বুঝেছিলেন। আর তাই তো তিনি ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সোচ্চার ভূমিকার নিয়ে বিদেশি শক্তির শাসন-শোষণের চির অবসানের পথে প্রথম পদক্ষেপ নেন।
বিদেশি শাসনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের এই ভূখ-ের সব মানুষই শোষণ থেকে মুক্তি চাইলেও সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত কোনো নির্মোহ নেতা তাদের ছিল না। ব্যক্তি মুজিবের নিষ্কলুষ ভাবমূর্তি, যা ছিল তার সহজাত; তা তাকে দ্রুতই রাজনীতির জটিল ময়দানে সামনের সারিতে নিয়ে আসে। যার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থেকে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে যুক্তফ্রন্টের সরকার গঠনে তার জোরালো ভূমিকা পালনে। বঙ্গবন্ধু সেই মন্ত্রিসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ঘটনাপ্রবাহ এত দ্রুত সফল পরিণতির দিকে প্রবাহিত হবে শেখ মুজিব নামে একজন তরুণের নেতৃত্বে, তা পূর্ব পাকিস্তান তো বটেই সমগ্র পাকিস্তান, এমনকি ভারতবর্ষের কোনো রাজনীতিবিদই আঁচ করতে পারেননি। যখন তারা বুঝলেন, তখন তাদের পথ ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। এ যেন ‘এলাম-দেখলাম-জয় করলাম’।
আসলে বঙ্গবন্ধু হাজার বছর ধরে নিপীড়িত বাঙালি জাতির অব্যক্ত বাসনা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। আর তাই তো তিনি এদেশের ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষকসমাজ, অর্থনীতিবিদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একটি ছাতায় নিচে একত্র করে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬-দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেন। সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ড. এসএ সামাদের এক লেখায় দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের বুকের ওপর বসে অর্থাৎ লাহোরে ৬-দফা ঘোষণা করেন, তখন তিনিসহ তার বাঙালি সহকর্মীরা প্রশ্ন করেন, ‘আপনার ৬-দফায় একটি দাবি আছে, পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক মুদ্রা। এ দাবির যৌক্তিকতা কী?’ তখন বঙ্গবন্ধু উত্তরে বলেন, ‘তোমরা এখন কাজ শেখো, আমার প্রশিক্ষিত লোক দরকার। এখন তোমাদের এসব চিন্তা করার দরকার নাই।’ এভাবে তিনি উত্তর এড়িয়ে যান। পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশÑ সেই এসএ সামাদ চট্টগ্রামের ডিসি। বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রাম সফরে গেলে দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসএ সামাদকে বলেন, ‘এবার বুঝেছো? কেন আমি ৬-দফায় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আলাদা মুদ্রা দাবি করেছি।’
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জেতার পর নানা টানাপড়েনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯৫৮ সালে ইস্কান্দার মির্জার কাছ থেকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখল কেন্দ্রীয় রাজনীতির পটপরিবর্তন করে দেয়। একই সময়ে ১৯৬৩ সালে হামিদুর রহমানের নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন-বিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর সার্বিক তত্ত্বাবধানে গঠিত হয় ছাত্র-যুব নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস। শ্রমিক এলাকাগুলোতে বিস্তার লাভ করে স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের শাখা। ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ ‘১৯৬৬ সাল’-এ উপস্থাপিত হয় স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ‘৬-দফা’ দাবি। ইতোমধ্যে গড়ে ওঠে উত্তাল ছাত্র আন্দোলন। গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ। ১৯৬৪ সালে আইয়ুবশাহী-বিরোধী সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে অবস্থান নিয়ে বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৮ সালে ছাত্র-সমাজ ১১-দফা দাবি উত্থাপন করে। বঙ্গবন্ধুর ৬-দফা এবং ছাত্র-সমাজের ১১-দফা দাবির আন্দোলন ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন। বঙ্গবন্ধু আগরতলা মামলা থেকে মুক্ত হয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন। পাকিস্তানের নতুন সামরিক প্রশাসক ইয়াহিয়া খান শাসনভার গ্রহণ করে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পূর্ব পাকিস্তানে ১৬৯টি জাতীয় পরিষদ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সে-সময় পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে পাকিস্তান পিপলস পার্টি আত্মপ্রকাশ করে। পাকিস্তানি সামরিক ও বেসামরিক শোষক গোষ্ঠীর নানা ষড়যন্ত্রে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বিঘিœত হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের হাতে সুযোগ আসে দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ‘স্বাধীনতা’ ঘোষণার। তিনি জেনেশুনে সঠিক কাজটিই করলেন। পাকিস্তানিরাও তাদের স্বভাবজাত কাজটি করল। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলো এবং শুরু হলো ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যা। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর বুকে আবির্ভাব হয় লাল-সবুজের পতাকাবাহী বাংলাদেশের। ৩০ লাখ শহিদের আত্মত্যাগ, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্র।
পাকিস্তানি সাময়িক জান্তা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় এবং ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে এসে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের হাল ধরেন। ১৭ জানুয়ারি ১৯৭২ দ্য টাইমস ম্যাগাজিনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ ও নির্মমতা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে তুলে করা হয় ৩০ লাখ মানুষ হত্যা, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির করুণগাঁথা। আনুমানিক ১৪ লাখ দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে ফেলা, সার্বিক যোগাযোগ-ব্যবস্থা ধ্বংস করে রেল ও সড়ক অবকাঠামো নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া, ব্রিজ-কালভার্ট বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বিনষ্ট করা, বন্দর যোগাযোগ অচল করে দেওয়াসহ একটি ভূখ-কে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করার সব চেষ্টাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী করেছিল। পাকসামরিক জান্তা ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে বুঝতে পারে যে বাঙালি মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাদের যৌথবাহিনীর কাছে তাদের পরাজয় অনিবার্য। তারা তখন ২৪ বছরের শাসন-শোষণের শেষ অংশে সকল স্থানান্তরযোগ্য সম্পদ যেমন বন্দরে আমদানিকৃত গাড়ি ও অন্যান্য মূল্যবান পণ্য, আর্থিক সম্পদ যেমন ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা-পয়সা ও সোনা-দানা, রপ্তানি আয়ের বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানে পাচারের কাজে লিপ্ত হয়। ওই প্রতিবেদনেই স্থানান্তরযোগ্য অর্থ-সম্পদ লুটে নেওয়ার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের চট্টগ্রাম বন্দর শাখায় ব্যাংকে সব টাকা পশ্চিম পাকিস্তানে ট্রান্সফার করার বিষয়টি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ব্যাংকটির ওই শাখায় ব্যালেন্স হিসেবে পাওয়া যায় মাত্র ১০ ডলার। এভাবে প্রতিটি ব্যাংকের সরকারি হিসাবের টাকা পশ্চিম পাকিস্তানে স্থানান্তর করা হয়। বন্দরে আমদানিকৃত গাড়ি খালাস না করতে দিয়ে এবং এখানকার রিকুইজেশন দেওয়া সব গাড়ি পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি বন্দরে আনলোড করা হয়। এই প্রতিবেদনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এ কারণে যে, পাকিস্তানি শাসকরা শুধু ২৪ বছরে বিভিন্ন পর্যায়-প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ থেকে সম্পদ পাচার করেনি, শেষ মুহূর্তেও তারা এই কাজে লিপ্ত ছিল। এতে আরও প্রমাণিত হয় যে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ জন্মের পর থেকে যেসব অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যুক্তি তুলে ধরেছিল, তা যথার্থ ছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবির যৌক্তিকতা বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী ছাত্র, শ্রমিক, যুবক, সাংস্কৃতিক, কর্মজীবী সংগঠন যে প্রক্রিয়ায় সমগ্র জাতির কাছে তুলে ধরেছিল, তা সব ধরনের গণতান্ত্রিক নিয়মাচার মেনেই করা হয়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধু সকল প্রকার গণতান্ত্রিক নিয়মাচারের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করেছেন। তিনি ৭ই মার্চের ভাষণে সুকৌশলে একদিকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার সুযোগ রেখেছেন ৪টি শর্ত উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে; অর্থাৎ পাকিস্তানি শাসকদের জন্য খোলা রেখেছেন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব দিয়ে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী অধ্যায়
বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার পরপরই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করে অল্প সময়ের মধ্যে দেশকে একটি সংবিধান দিয়েছেন, নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রচলন করেছেন। অর্থনৈতিক কর্মসূচি দিয়েছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্য। শিক্ষানীতি, স্বাস্থ্যনীতি, প্রশাসনিক নীতি ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করেছেন। সুখী-সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তিনি প্রয়োজনীয় যাবতীয় উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেনÑ বাংলাদেশে বঞ্চিত হয় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা থেকেÑ স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই।
বিগত ৫০ বছরে জাতি-রাষ্ট্র বাংলাদেশের অর্জন
জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অর্জন পর্যালোচনা করতে গেলে আমাদের প্রথমেই দেখতে হবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠালগ্নে যে রাজনৈতিক অর্থনীতির ধারণা নিয়ে জাতি-রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছে এবং যারা ওই ধারণার প্রবক্তা ছিলেন, তারা কত সময় এই কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তা আলোচনা করা দরকার।
১৯৭২-৭৫ : মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সিক্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (৩.৫) বছর; ১৯৭৫-৯০ : সামরিক স্বৈরশাসক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী (১৫ বছর); ১৯৯১-৯৫ : সামরিক উর্দির আড়ালে গণতন্ত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী (৫ বছর); ১৯৯৬-২০০০ : মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সিক্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (৫ বছর); ২০০১-০৬ : বিএপি-জামাত জোট (৫ বছর); ২০০৭-০৮ : মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী সেনাশাসন (২ বছর); ২০০৯-২১ : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসিক্ত (১৩ বছর)। দেখা যায় যে ৫০ বছরের মধ্যে ২৯ বছরই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীরা বাংলাদেশে রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। মাত্র ২১ বছর এ নিয়ন্ত্রণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সিক্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আজ দেশের যে উন্নয়ন আমরা দেখছি, এই উন্নয়নের দাবিদার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগই।
মার্কিন সাংবাদিক নিকোলাস ক্রিস্টপ (২০২১) লিখেছেন, ৫০ বছর আগে মার্চ মাসের গণহত্যা, ক্ষুধা ও অবহেলার মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়েছিল। হেনরি কিসিঞ্জার ওই সময় বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে মন্তব্য করেছিলেন ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের উল্লেখ করেন। ১৯৯১ প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে ১ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। তখন তিনি নিউইয়র্ক টাইমসে লেখেন, ‘বাংলাদেশ অত্যন্ত দুর্ভাগা দেশ। কিন্তু বিগত তিন দশকে আমার সব ধারণা ভুল প্রমাণিত করে বাংলাদেশ অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে।’ নিকোলাস ক্রিস্টপ আরও উল্লেখ করেন যে, বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমান মহামারির আগে চার বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রতিবছর ৭-৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা চীনের চাইতেও দ্রুততর। এছাড়া বাংলাদেশের গড় আয়ু ৭২ বছর। ক্রিস্টপ লেখেন, বাংলাদেশ এক সময়ের হতাশা কাটিয়ে এখন অনেক দেশের জন্য উন্নয়নের মডেল হতে পারে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারে দারিদ্র্য বিমোচনে। ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশের ৩০ শতাংশের কম শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয় সমাপ্ত করতে পারত। কিন্তু বর্তমানে ৯৮ শতাংশ শিশু প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে। আগে নারী-পুরুষের বৈষম্য ব্যাপক থাকলেও এখন বাংলাদেশের উচ্চ বিদ্যালয়ে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের সংখ্যাই বেশি। নারীদের কর্মসংস্থানের বড় জায়গা হয়ে উঠেছে পোশাক শিল্প। বিশ্বের উন্নত দেশের মানুষ যে শার্টটি পরছেন, সেটি বাংলাদেশের কোনো নারীর হাতে তৈরি। এককালের কৃষিনির্ভর বাংলাদেশ এখন চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তৈরি পোশাক শিল্প রপ্তানিকারক দেশ। বাংলাদেশের শিক্ষিত নারীরা এখন গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন এনজিওতে উচ্চপদে কাজ করেন। এ নারীরাই আবার শিশুদের টিকাদানে কাজ করছে, মানুষকে টয়লেট ব্যবহারে সচেতন করছে এবং বাল্যবিবাহকে নিরুৎসাহিত করছে। এছাড়া বাংলাদেশে অপুষ্টিজনিত শিশুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে, যা এখন প্রতিবেশী দেশ ভারতের চেয়েও কম। বাংলাদেশের নারীদের এখন প্রত্যেকের মাত্র দুটি করে সন্তান রয়েছে, আগে যা ছিল সাত-আট জন।
মোটা দাগে বাংলাদেশের ৫০ বছরের জিডিপির তথ্য এ-রকম প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ৪ শতাংশ, দ্বিতীয় ৩.৮ শতাংশ, তৃতীয় ৩.৮ শতাংশ, চতুর্থ ৪.২ শতাংশ, পঞ্চম ৫.১ শতাংশ, ষষ্ঠ ৬.৩ শতাংশ এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ২০১৬-২০ সময়ে ৭.১৩ শতাংশ। অন্যদিকে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি শতাংশ হরে অর্জিত হয়েছে যথাক্রমে প্রথম : ১.৩ শতাংশ, দ্বিতীয় : ১.৫ শতাংশ, তৃতীয় : ১.৬ শতাংশ, চতুর্থ : ২.৪ শতাংশ, পঞ্চম : ৩.৫ শতাংশ, ষষ্ঠ : ৪.৯ শতাংশ এবং সপ্তম : ২০১৬-২০ ৫.৭৩ শতাংশ। মাথাপিছু জিএনআই মার্কিন ডলারে দেখায় প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ১১১ ডলার, দ্বিতীয় : ১৪৫, তৃতীয় : ২০৪, চতুর্থ : ২৫৩, পঞ্চম : ৪৩১, ষষ্ঠ : ১৩১৪ এবং সপ্তম : পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ২ হাজার ৬৪ মার্কিন ডলার। ২০২১ সালে দেখা যায়, ২ হাজার ২২৭ ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বপক্ষের শক্তি যখনই ক্ষমতায় ছিল, তখন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতি লক্ষণীয়। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন দেশের অর্থনৈতিক প্রগতিতে ঋণাত্মক গতি পরিলক্ষিত হয়।
পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, বিগত ৫০ বছরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীরা নানারূপে দেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে, মোটা দাগে ২৯ বছর। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সিক্ত রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে ২০২১ সাল পর্যন্ত ২১ বছর। যতটুকু ধনাত্মক অর্জন, তা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের রাজনৈতিক অর্থনীতির অর্জন; আর যতটুকু ঋণাত্মক অর্জন, তার দায়ভার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী সময়কালের ঋণাত্মক ফসলের। এর ফলাফল সব সময় জাতির ওপরই পড়েছে, যা পুষিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে আমাদের দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তিকে।
মূলত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ১৯৯৬ সালে গঠিত মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক জোট এদেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন করে যাচ্ছে। নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, অর্থনীতি পরিচালনায় দক্ষতা, নীতিসহায়তা, শিল্পনীতি, আমদানি-রপ্তানি, দেশজ শিল্পের অগ্রাধিকার, মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে বর্তমান রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার স্তম্ভসমূহ কার্যকর করা হয়েছে। যেমন Energy Regulatory Commission, Insurance Regulatory Commission, Telecom Regulatory Commission, Competition Commission, Separation of Investment Banking from Commercial Banking ইত্যাদি। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জোট জননেত্রী শেখ হাসিনা সারাবিশ্বের প্রশংসা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও কোভিড ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রশংসা অর্জন করেছে। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সিক্ত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি বাংলাদেশের আপামর জনগণ এবং বিশ্ব নেতৃত্বের আস্থা অর্জন করেছে। এটা আরও বৃদ্ধি পাবে।

শেষ কথা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিজে তার জন্মভূমি বাংলাদেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থানের বিষয় অনুধাবন করতে পেরেছেন বলেই তিনি তৎকালীন ছাত্র-যুব-শ্রমিকসহ সর্বস্তরের বুদ্ধিজীবীদের কাছে Economically Feasible  বাংলাদেশের তত্ত্ব হাজির করেছেন তখন এদেশের সমসাময়িক অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে গ্রহণযোগ্য এজেন্ডায় অগ্রাধিকার পায়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের মাথায় ছিল জাতি-রাষ্ট্র বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান। অর্থাৎ সমুদ্রপাড়ের সব দেশ উন্নত দেশে রূপান্তর হয়েছে, যার মধ্যে ব্যতিক্রম হলো ৫টি দেশ, তন্মধ্যে একটি বাংলাদেশ, দ্বিতীয় পাকিস্তান, তৃতীয় সোমালিয়া, চতুর্থ উত্তর ইয়েমেন এবং পঞ্চম দক্ষিণ ইয়েমেন। দুঃখের বিষয় এই ৫টি দেশই মুসলিমপ্রধান দেশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বুঝতে পেরেছিলেন, তূলনামূলক বিচারে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান রাজনৈতিক অর্থনীতির বিবেচনায় এদেশের সাফল্য নিশ্চিত। তাই তিনি পাকিস্তানের দুই অর্থনীতি তত্ত্ব হাজির করেন ৬-দফার মাধ্যমে। জন্মের পর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারাই ঠাট্টা-তামাশা করেছেন, সেসব ব্যক্তি-দেশ-সংস্থা-মিডিয়া এখন বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা বলে মুখ খুলছেন এবং অতীতের ভুল স্বীকার করে বলছেন- বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। কারণ, বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার টাইগার অর্থনীতি খেতাবে ভূষিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে, ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর দেশ পরিচালনায় দক্ষতা ও নিপুণতা দেখিয়েছেন তা বিস্ময়কর। ভৌত কাঠামো, আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক কাঠামো, রেগুলেটরি কাঠামো, পদ্মাসেতু নির্মাণ, সড়ক-রেলপথ নির্মাণ, বিদ্যুৎ স্বয়ংসম্পূর্ণতা, বাংলাদেশকে Export Hub  তৈরিতে দক্ষতা, বিদেশি ঋণনির্ভরতা কমানো, ইকনোমিক জোন প্রতিষ্ঠা করে কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে শিল্পনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় অগ্রসরমান আজকের বাংলাদেশ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, বাংলাদেশ পোশাক শিল্পে পৃথিবীতে দ্বিতীয় অবস্থানে চীনের পর। আরও অনেক অর্জন আছে বাংলাদেশের। বাংলাদেশে সঠিক পথেই আছে এবং সঠিক পথে চলার ভিত্তি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে।
জাতি-রাষ্ট্র বাংলাদেশের উন্নত দেশ হওয়ার তুলনামূলক সুবিধা আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশ একটি ‘একক প্রজাতন্ত্র’। এ জাতীয় প্রজাতন্ত্রের গঠনকাঠামোতে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা অপেক্ষাকৃত সহজতর বিষয়। যেমনÑ রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, বাণিজ্যিক স্বার্থ, সামাজিক সুরক্ষার স্বার্থ, আয় বৈষম্য কমানো, ধর্মীয় স্বাধীনতার সুরক্ষা, সুযোগের সমতা প্রভৃতি নিশ্চিত করা সহজ। অন্যদিকে ফেডারেল ব্যবস্থায় আইনের ভিন্নতা, ভাষার ভিন্নতা, জাতিগত ভিন্নতা, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা এবং কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মধ্যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দ্বৈত মতাদর্শ দীর্ঘসূত্রতার জন্ম দেয়। এর ফলে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া দ্বন্দ্বে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ভারতের কথাÑ যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারে আছে বিজেপির নেতৃত্বাধীন সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার; কিন্তু বিভিন্ন রাজ্যে আছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মতাদর্শের সরকার। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ভারতের সামগ্রিক জাতীয় উন্নতিতে অনেক বেশি সময় লাগবে, গণচীনের তুলনায়। বেশির ভাগ উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ এ ব্যাপারে একমত যে, এককেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ভিত্তিতে গঠিত উন্নয়ন দর্শন বাস্তবায়ন করা বেশি সহজতর। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের সাংবিধানিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় ইউনিটারি সিস্টেমের সুযোগে এক ভাষা, এক সংস্কৃতি এবং এক দেশভিত্তিক একক উন্নয়ন দর্শন রয়েছে। একক অর্থনৈতিক দর্শন, একক আইনি ব্যবস্থা, সর্বোপরি কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং সমুদ্রপাড়ের দেশ হওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে হবে। আমাদের জন্য সুযোগের দরজা খোলা থাকবে অদূর ভবিষ্যতেও। তবে এসব সুযোগ দ্রুত কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন তরান্বিত করাই মঙ্গলজনক হবে।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply